https://www.somoyerdarpan.com/

3787

international

পারমাণবিক অস্ত্র আর উত্তেজিত নেতৃত্ব—বিশ্ব কি বিপদের মুখে?

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০৯

ছবি:সংগৃহীত

আমেরিকার পারমাণবিক অস্ত্রাগার কার্যত ‘হেয়ার-ট্রিগার’ অবস্থায় আছে। অর্থাৎ, আক্রমণের সতর্কবার্তা পাওয়া বা আক্রমণের জবাবে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পারমাণবিক হামলা শুরু করার মতো প্রস্তুতি রাখা হয়। এই সিদ্ধান্তের ‘ট্রিগার’ হলো তথাকথিত ‘নিউক্লিয়ার ফুটবল’- যা একটি ব্রিফকেস। তার মধ্যে হামলার পরিকল্পনা ও কোড থাকে। এটি সবসময় একজন সামরিক কর্মকর্তার হাতে থাকে। তিনি প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে কখনোই খুব দূরে থাকেন না। শুধু প্রেসিডেন্টই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিতে পারেন। ২০০৮ সালে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি বলেছিলেন, ‘তিনি কারও সঙ্গে যথার্থতা যাচাই করতে বাধ্য নন। তিনি কংগ্রেসকে ফোন করতে বাধ্য নন। তিনি আদালতের সঙ্গে পরামর্শ করতেও বাধ্য নন।’ অর্থাৎ চাইলেই ট্রিগার টিপে দিতে পারেন।
কিন্তু এখন দুঃস্বপ্নের মতো পরিস্থিতি হলো- একজন মানসিকভাবে অস্থিতিশীল প্রেসিডেন্ট কোনো অযৌক্তিক পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেবেন!

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণ নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল, কূটনীতিক, বিদেশি কর্মকর্তা এবং এমনকি তার সাবেক মিত্র ও সমর্থকদের মধ্যেও তার মানসিক স্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পোপ লিও’র বিরুদ্ধে আক্রমণ করেছেন ট্রাম্প। এরপর তিনি নিজের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্মিত ছবি পোস্ট করেছেন, যেখানে তাকে যিশু খ্রিস্ট হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিনি হাইতিয়ান এক ব্যক্তির নির্মম হাতুড়ি দিয়ে হত্যার ভিডিও পোস্ট করেছেন। তিনি ইরানের সভ্যতাকে শেষ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের ইস্টার এগ রোল অনুষ্ঠানে একটি বিশাল খরগোশের পোশাক পরা ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে তিনি শিশুদের সামনে ইরান যুদ্ধ নিয়ে গর্ব করেছেন।

এক জরিপ অনুযায়ী, প্রতি দশজন আমেরিকানের মধ্যে ছয়জন মনে করেন ট্রাম্প বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছেন। একজন সম্ভাব্য অস্থিতিশীল প্রেসিডেন্ট এবং দেশের পারমাণবিক অস্ত্রাগারের মধ্যে দুটি ঘটনা দেখায় যে, সম্ভাব্য ধ্বংসযজ্ঞ থামানো অনেকাংশে নির্ভর করে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিয়োজিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মানের ওপর।

১৯৭৪ সালের গ্রীষ্মে, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির চাপে যখন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ক্ষমতা প্রায় হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি মানসিক চাপে ভুগছিলেন এবং প্রচুর মদ্যপান করছিলেন। সহকারীরা তাকে হোয়াইট হাউসের অন্ধকার কক্ষে একা বসে থাকতে দেখেছিলেন। নিক্সন একদল কংগ্রেস সদস্যকে বলেছিলেন, ‘আমি আমার অফিসে গিয়ে একটি ফোন তুললেই ২৫ মিনিটের মধ্যে ৭ কোটি মানুষ মারা যেতে পারে।’

ভীত সেনেটর অ্যালান ক্র্যানস্টন (ডেমোক্র্যাট, ক্যালিফোর্নিয়া) তখনকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস শ্লেসিঞ্জারকে ফোন করে সতর্ক করেন যে, ‘একজন উন্মত্ত প্রেসিডেন্টকে মহাবিপর্যয় ঘটানো থেকে থামানোর প্রয়োজন আছে।’ শ্লেসিঞ্জার, যিনি আগে অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে নেন। তিনি সামরিক কমান্ডারদের নির্দেশ দেন- নিক্সন যদি কোনো পারমাণবিক হামলার আদেশ দেন, তবে তা কার্যকর করার আগে যেন তার বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে বিষয়টি যাচাই করা হয়। সৌভাগ্যবশত নিক্সন কখনো এমন চরম পদক্ষেপ নেননি।

অন্য ঘটনাটি ঘটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হামলার পর প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মিলিকে ফোন করে আশ্বস্ত হতে চান যে, তিনি কোনো ‘অস্থিতিশীল প্রেসিডেন্টকে’ পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দিতে দেবেন না। মিলি স্বীকার করেন যে, ট্রাম্প একাই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিতে পারেন। তবে তিনি বলেন, ‘তিনি একা সিদ্ধান্ত নেন না। একজন নির্দেশ দিতে পারেন, কিন্তু কয়েকজনের সম্মতি ছাড়া তা কার্যকর হয় না।’

মিলি, শ্লেসিঞ্জারের মতোই, সম্ভাব্য সামরিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাকে অবহিত রাখার ব্যবস্থা নেন। সৌভাগ্যক্রমে কোনো ঘটনা ঘটেনি। এই ঘটনাগুলোর শিক্ষা হলো- যে কোনো দুঃস্বপ্নময় পরিস্থিতিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন নির্ভর করতে পারে দায়িত্বশীল, বিচক্ষণ উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের ওপর। তাদের প্রয়োজন অসাধারণ বিচারবুদ্ধি, দেশের প্রতি আনুগত্য (শুধু প্রেসিডেন্ট নয়) এবং প্রয়োজনে সীমা অতিক্রম করার সাহস।

এই মুহূর্তকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে এই বাস্তবতা যে, ভবিষ্যতের এমন সংকট পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে যিনি থাকতে পারেন তিনি হলেন পিট হেগসেথ, যিনি শ্লেসিঞ্জার বা মিলির মতো গুণাবলি ধারণ করেন না বলে লেখকের দাবি। তিনি মৃত্য ও ধ্বংসকে মহিমান্বিত করেন এবং মনে করেন তিনি ইরানে পবিত্র যুদ্ধ লড়ছেন।

(লেখক কার্টার ও রিগ্যান প্রশাসনের ফেডারেল প্রসিকিউটর এবং অ্যাবস্ক্যামমামলার তদন্ত দলের সদস্য। তিনি ‘ইনটু সাইবেরিয়া: জর্জ কান্নান্স এপিক জার্নি থ্রু দ্য ব্রুটাল, ফ্রোজেন হার্ট অব রাশিয়া’ বইটির লেখক। তার এ লেখাটি অনলাইন দ্য হিল থেকে অনুবাদ)