https://www.somoyerdarpan.com/
3592
special-report
প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০২৬ ১২:০৩
ছবি-সংগৃহীত
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে ২৫শে মার্চ একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন। যেসব দিন দল, মত ও পক্ষ-বিপক্ষ ছিন্ন করে জাতির সম্মিলিত দিনে পরিণত হয়, তেমনি এক রক্তাক্ত অক্ষরে লিপিবদ্ধ দিন ২৫ শে মার্চ।
২৫শে মার্চ একইসঙ্গে গণহত্যার সূচনা, স্বাধীনতার প্রেরণা এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ছিল একটি পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ, যার লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি ধ্বংস করার মাধ্যমে স্বাধীনতার স্পৃহাকে পদদলিত করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে স্পষ্টভাবে গণহত্যার অন্তর্ভুক্ত।
২৫শে মার্চের হত্যাযজ্ঞই বাঙালির প্রতিরোধকে তীব্র করে তোলে এবং পরদিন স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ঘটে। ফলে ২৫শে মার্চকে স্বাধীনতার পূর্বশর্ত হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। বলা যায়, স্বাধীনতাকামী বাঙালির সংগ্রামশীলতার শেষ অধ্যায়ের সূচনা ঘটে ২৫শে মার্চ।
বিশ্ব ইতিহাসের অন্যান্য গণহত্যা—আর্মেনিয়া, ইহুদি হলোকাস্ট, কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা ও স্রেব্রেনিকার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, পরিকল্পিত নির্মূল, সংখ্যালঘু নিধন এবং আন্তর্জাতিক নীরবতার দিক থেকে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তাদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে এসব ঘটনার তুলনায় বাংলাদেশের গণহত্যা এখনো পূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। এই না পাওয়ার বিষয়টি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্ততার প্রমাণবহ। বিভাজন ও দলীয় ক্ষুদ্র দৃষ্টিভঙ্গি বার বার বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে জাতীয় বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে, যা মোটেও কাম্য নয় এবং জাতীয় সংহতির জন্য ইতিবাচক তো নয়ই, বরং ক্ষতিকর।
এমনই পটভূমিতে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত প্রস্তাবনা, যেখানে ২৫শে মার্চের ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতির আহ্বান জানানো হয়েছে, ইতিহাসের এই দীর্ঘ নীরবতা ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’-এর মতো ঐতিহাসিক দলিল এই সত্যকে আরও শক্তিশালী করে।
এই দিনটির গুরুত্ব কয়েকটি কারণে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ এটি গণহত্যার আন্তর্জাতিক সংজ্ঞার একটি বাস্তব উদাহরণ। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনার প্রতীক। এটি সংখ্যালঘু সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে এবং স্মৃতির রাজনীতি ও ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। সামগ্রিকভাবে এটি স্বাধীনতার নৈতিক ভিত্তিকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেয়
বিশ্বের বিভিন্ন গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে বিচার হয়েছে, তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো সীমিত। তাই ভবিষ্যতে জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। আর এজন্য সরকারের উদ্যোগ জরুরি।
২৫শে মার্চ কেবল একটি শোকাবহ দিন নয়; এটি একটি শিক্ষা, সতর্কবার্তা এবং স্বাধীনতামুখী প্রেরণার উৎস। সঠিক ইতিহাসচর্চা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং প্রজন্মান্তরে এই সত্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা—এই তিনটি লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমেই এই দিনের তাৎপর্য পূর্ণতা পাবে। কারণ, দিনটি কোনো দলের বা গোষ্ঠীর নয়।
মনে রাখা দরকার, ২৫শে মার্চ কোনো দল, গোষ্ঠী বা অঞ্চলের নয়—এটি সমগ্র বাঙালি জাতির এক অভিন্ন স্মৃতি ও চেতনার দিন। এই দিনটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত, কারণ এদিনের ভয়াবহ গণহত্যা শুধু মৃত্যু ও ধ্বংস ডেকে আনেনি; বরং তা বাঙালির অন্তরে এক অদম্য প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং আত্মমর্যাদার আগুন প্রজ্বলিত করেছিল।
২৫শে মার্চের সেই রক্তাক্ত রাত ছিল ইতিহাসের এক নির্মম বাঁকবদল। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞের লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতিকে স্তব্ধ করে দেওয়া, তাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে চিরতরে দমন করা। কিন্তু এই দমননীতিই উল্টো বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তোলে। গণহত্যার রক্ত যেন প্রতিরোধের শপথে পরিণত হয়, ভয় পরিণত হয় সাহসে, আর নিস্তব্ধতা রূপ নেয় গর্জনে।
এই প্রেক্ষাপটে ২৫শে মার্চ কেবল একটি ট্র্যাজেডির দিন নয়: একটি জাগরণের মুহূর্ত। এদিনের নির্মমতা বাঙালিকে বুঝিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা ছাড়া তাদের অস্তিত্ব নিরাপদ নয়। ফলে পরদিন থেকেই যে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা, তার বীজ নিহিত ছিল এই রাতের অভিজ্ঞতায়। অর্থাৎ, গণহত্যার ভস্মস্তূপ থেকেই জন্ম নেয় স্বাধীনতার স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নই রূপ নেয় একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র—বাংলাদেশে।
এই কারণেই বলা যায়, ২৫শে মার্চ স্বাধীনতার পথরেখা অঙ্কনের এক মৌলিক প্রেরণাস্থল। এটি এমন এক দিন, যা আমাদের শেখায়—অত্যাচারের বিরুদ্ধে নীরবতা নয়, প্রতিরোধই ইতিহাসকে বদলে দেয়। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মুক্তি কোনো দান নয়; এটি অর্জন করতে হয় ত্যাগ, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে।
অতএব, স্বাধীনতা ও মুক্তির অন্বেষায় এবং গণহত্যার বিরুদ্ধে মানবিক অবস্থান গ্রহণে ২৫শে মার্চ এক জ্বলন্ত আলোকবর্তিকা। এটি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক নৈতিক দিকনির্দেশনা—যেখানে অন্যায়, দমন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই মানবতার প্রকৃত পরিচয়।
লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।